সোমবার | ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং |

টাঙ্গাইলে লাশ দাফন ফি ২০ হাজার টাকা

টাঙ্গাইল, বুধবার, ২৯ আগস্ট ২০১৮:
কবরস্থানে প্রতি লাশ দাফন ফি ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী ইউনিয়নের খারজানা আলীয়া মাদরাসা সংলগ্ন কবরস্থানে এ প্রথা চালু করা হয়েছে।

চালু হওয়া এ অলিখিত প্রথার ফলে মৃতদেহ দাফন করতে না পারাসহ ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন স্থানীয়রা। তবে লাশ দাফনে ফি আদায়ের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা এ প্রথা বন্ধে কার্যকর ভূমিকাও রাখতে পারছেন না এই গ্রামের মানুষ।

জানা যায়, ১৯৮২ সালে ৩৮ শতাংশ স্থানীয়দের দানকৃত জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় খারজানা কবরস্থান। খারজানা গ্রামের প্রায় সহস্রাধিক মানুষের লাশ দাফনের প্রয়োজনে এ কবরস্থানটি স্থাপিত হয়। এ কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার স্বার্থে দুই বছর মেয়াদী একটি পরিচালনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে ও পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়ে আসছে কবরস্থানের উন্নয়ন আর রক্ষণাবেক্ষণ। তবে প্রতিষ্ঠাকালে কবরস্থানে লাশ দাফন বাবদ ছিল না কোনো ফি নির্ধারণ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কবরস্থান পরিচালনার বর্তমান কমিটির মেয়াদকাল শেষ হলেও জোড়পূর্বক দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছে এ কমিটি। এ কমিটিই দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অলিখিতভাবে লাশ দাফন বাবদ ২০ হাজার টাকা জমা দেয়ার প্রথাটি চালু করেন। এ প্রথা চালুর ক্ষেত্রে স্থানীয়দের কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াই কমিটির নেতৃবৃন্দ এককভাবে ও জোড়পূর্বক এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। লাশ দাফন বাবদ টাকা আদায়ে স্থানীয়দের কোনো সম্মতি না থাকলেও কমিটির সভাপতি তফিজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক ও এলজিইডি কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের, সদস্য লাল মিয়া ও সোলায়মান, নুরুল ইসলামসহ কতিপয় সন্ত্রাসীরা জোড়পূর্বক এই টাকা উত্তোলনে লিপ্ত রয়েছেন বলেও জানান তারা। এছাড়া উত্তোলনকৃত এই টাকার কোনো রশিদও দিচ্ছেন না উত্তোলনকারীরা। টাকা উত্তোলনের স্বার্থে যারা টাকা দিতে পারছে না বা টাকা দিতে আপত্তি করছেন তাদের লাশ ওই কবরস্থানে দাফনও করতে দিচ্ছেন না তারা। তবে এভাবে টাকা উত্তোলন করা হলেও কবরস্থানের মান উন্নয়নে কার্যকর কোনো ভূমিকাও রাখছে না এই কবরস্থান পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ।

তবে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহকালে কবরস্থানের কোষাধ্যক্ষ রমজান আলীর লিখিত খাতায় লাশ দাফন বাবদ টাকা উত্তোলনের কিছু হিসাব থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুবরণকারী খারজানা উত্তরপাড়ার মিয়া উল্লাহর ছেলে ও সেনা সদস্য রাজ্জাকের দাফন বাবদ ফি আদায় করা হয় ১২ হাজার টাকা। একই বছরের ২৩ জুন একই গ্রামের গোলজারের মেয়ের লাশ দাফন বাবদ দেড় হাজার টাকা, ৮ সেপ্টেম্বর উত্তরপাড়ার আব্দুস ছবুর মুন্সীর স্ত্রী দাফন বাবদ ৫ হাজার, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল পূর্বপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দিনের স্ত্রী দাফন বাবদ ৫ হাজার, ২২ এপ্রিল কাতুলী আলমের দাফন বাবদ দেড় হাজার টাকা, ২৮ এপ্রিল ঝিনাইপাড়াস্থ নুরু ইসলামের দাফন বাবদ ৭ হাজার, ৪ মে উত্তরপাড়ার আব্দুল মালেকের মেয়ের দাফন বাবদ দেড় হাজার টাকা টাকা।

এ নিয়ে মা ফিরোজা বেগমের লাশ দাফন করতে না পারা ভুক্তভোগী খারজানা উত্তরপাড়ার মনির হোসেন জাগো নিউজকে জানান, গত ১৭ আগস্ট সকালে মৃত্যুবরণ করেন তার মা ফিরোজা বেগম। তবে কবরস্থান পরিচালনা কমিটির দাবিকৃত ওই ২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় তার মাকে ওই কবরস্থানে দাফন করতে দেয়া হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি বাড়ির পাশে তার মায়ের লাশ দাফন করেন বলেও জানান তিনি।

ধর্মীয় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ও সম্পূর্ণ নিয়ম বর্হিভূতভাবে লাশ দাফন বাবদ এ ফি আদায়ে স্থানীয় হতদরিদ্র পরিবারগুলো চরম সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খারজানা ঘোনাপাড়া বায়তুন নূর জামে মসজিদের ঈমাম মো. কালাচাঁন মুন্সী।

খারজানা কবরস্থান পরিচালনা কমিটি সদস্য লাল মিয়া লাশ দাফন বাবদ টাকা উত্তোলনের কথা স্বীকার করে জানান, নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ কোনো টাকা নেয়া হচ্ছে না। যদিও অতীতে এ টাকা নেয়ার নিয়ম না থাকলেও এখন কবরস্থানে মাটি ভরাটসহ নানা প্রয়োজনে এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারের সামর্থ অনুসারে এই ফি নেয়া হচ্ছে।

তবে এ প্রসঙ্গে ও বক্তব্য গ্রহণের উদ্দেশ্যে কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং খাগড়াছড়ি এলজিইডি কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের বাসায় অবস্থান করা সত্ত্বে নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। এ সত্ত্বেও বুধবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে অসংখ্যবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
এছাড়াও কমিটির সভাপতি তফিজ উদ্দিন অতি বয়োবৃদ্ধ ও শয্যশায়ী থাকায় মানবিক কারণে তার বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে পোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজমত আলী জানান, খারজানা কবরস্থানে লাশ দাফন বাবদ ২০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ ও আদায় করার কোনো অভিযোগ তিনি এখনও পাননি। তবে যদি এ ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয় তাহলে তিনি পরিষদের পক্ষ থেকে এই অপকর্ম বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলেও জানান তিনি।

fb-share-icon35
fb-share-icon20

Enjoy this blog? Please spread the word :)