রবিবার | ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং |

হায়রে বাংলাদেশ! হায়রে মিস ওয়ার্ল্ড!

হায়রে বাংলাদেশ- পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পণ্যের প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে সুন্দরী নারীদের ব্যবহারের কারণ বা প্রয়োজনীয়তা কাউকে আর বলে বোঝাতে হয় না। সুন্দরীদের সন্ধানে চালু হওয়া প্রতিযোগিতা এক সময় বৈশ্বিক রূপ পেয়ে গেল ‘মিস ওয়ার্ল্ড বিউটি কনটেস্ট’ নামে। তাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে নিজেকে মেলে ধরার অনুপ্রেরণা পেল নারীরা।

সুন্দরী প্রতিযোগিতার কনসেপ্টটা যদিও আপত্তিকর। তবুও, বৈশ্বিক পর্যায়ে যে প্রতিযোগিতাগুলো হয়, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ খুব কম। কারণ সেখানে ত্বকের রঙ আর শরীরের গঠনের চেয়ে বড় করে দেখা হয় মেধা, প্রতিভা আর ব্যক্তিত্বকে। সেটা না হলে তো আর নাইজেরিয়া বা অ্যাঙ্গোলা থেকে আসা প্রতিযোগীরা কখনও মিস ওয়ার্ল্ড হতে পারতেন না।

সুন্দরী প্রতিযোগিতার সাথে মুসলিমপ্রধান এই দেশের মানুষের পরিচয় যদিও বেশি দিনের নয়, তবু আজকাল বিশ্বসুন্দরীর মুকুটজয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশি মেয়েদের চোখেও। তাই মিস ওয়ার্ল্ড বিউটি কনটেস্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী বাছাইয়ের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা।

ঢাকার মেয়ে আনিকা তাহের (১৯৯৪), ইয়াসমিন বিলকিস সাথী (১৯৯৫), রেহনুমা দিলরুবা চিত্রা (১৯৯৬), শায়লা সিমি (১৯৯৯), সোনাই গাজী (২০০০), তাবাসসুম ফেরদৌস শাওন (২০০১), জেসিয়া ইসলাম (২০১৭), রাজশাহীর মেয়ে তানিয়া রহমান তন্বী (১৯৯৮), খুলনার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া (২০০৭), বরিশালের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী (২০১৮) গত ২৫ বছরের নির্বাচিতা প্রতিযোগী। এর মধ্যে ১৯৯৭, ২০০১-২০০৬, ২০০৮-২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়নি এই প্রতিযোগিতা।

ডানপাশে উপরে ঐশ্বরিয়া রাই ও নিচে প্রিয়াঙ্কা, চোপড়া, বামপাশে উপরে মানুষী চিল্লার ও নিচে যুক্তামুখী (ভারত) এবং মাঝখানে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ নির্বাচিতা জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী

কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ‘মিস ওয়ার্ল্ড বিউটি কনটেস্ট’ আন্তর্জাতিক পরিসরের একটি প্রতিযোগিতা হয়ে যাওয়ায় সুন্দর মুখচ্ছবির পাশাপাশি প্রাধান্য পাচ্ছে সুন্দরীদের ব্যক্তিত্ব, মেধা ও প্রতিভার যোগ্যতাও। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব যিনি করবেন, তাকে অবশ্যই চেহারা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে হবে না। সারা দুনিয়ার গণমাধ্যমে কোটি কোটি উৎসুক চোখ আমাদের প্রতিযোগীকে দেখবেন। প্রতিযোগিতায় জয়ী হোন বা না-ই হোন, দেশকে হাসির পাত্র বানানোর অধিকার কারো নেই।

মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ -২০১৮ গ্র্যান্ড ফিনালের কয়েকটা ভিডিও ক্লিপস ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেরা দশ প্রতিযোগীর একজনকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘H2O কী?’ তিনি খানিকক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন, ‘এই নামে ধানমন্ডিতে একটা রেস্টুরন্ট আছে।’ আরেক প্রতিযোগীর কাছে জানতে চাওয়া হলো, তাকে একটা ‘উইশ’ পূরণ করার সুযোগ দিলে তিনি কোনটা পূরণ করতে চাইবেন। সেই প্রতিযোগীর আবোলতাবোল বকা দেখেই বোঝা গেছে, তিনি ‘উইশ’ (Wish) শব্দের মানেই জানেন না।

মিস ওয়ার্ল্ডের মতো একটা প্রতিযোগিতায় যিনি বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তিনি ফাইনাল রাউন্ড পর্যন্ত এসেছেন কোন গুণের জোরে? কী দেখে এদের ফাইনালে তোলা হয়েছিল? গায়ের ফর্সা চামড়া আর ৩৬-২৪-৩৬ সাইজের বডি শেপ? এমন এক বিউটি কনটেস্টের মঞ্চে বিচারকদের একজন আবার বিশিষ্ট উল্কাবিদ খালেদ হোসাইন সুজন, যিনি ‘শবে কদরের রাতে উল্কাপতন হয় না’ তত্বের উদগাতা। এমন অদ্ভুত মগজসম্পন্ন বিচারক যেখানে থাকে, সেখানে সুন্দরী প্রতিযোগীদের মেধা-প্রতিভার যাচাই করবে-টা কে?

ইউরোপ-আমেরিকা যাবার দরকার নেই, পাশের দেশ ভারত থেকে যারা মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জিতেছিলেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার দিকে তাকালেই বোঝা যায় কাদেরকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে বাছাই করা উচিত আর তাদের বাছাইকারীদের যোগ্যতা কোন মাপের হওয়া উচিত। ১৯৯৪ সালে ৪৪তম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় মুকুট জয়ের আগে কর্নাটকের মেয়ে ঐশ্বরিয়া রাই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী। মহারাষ্ট্র প্রদেশের সবগুলো কলেজ মিলিয়ে টপ লেভেল স্টুডেন্ট ছিলেন তিনি। শুধু গায়ের রঙ বা ফিগার দিয়ে এ মুকুট পাননি, মেধা আর প্রতিভাও তাকে সাহায্য করেছে।

২০০০ সালে ৫০তম মিস ওয়ার্ল্ড আসরে মুকুটজয়ী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বিশ্বসুন্দরীর খেতাব জিতেছিলেন ইন্টারমিডিয়েট শেষেই। এরপর গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বলিউড-হলিউডে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজক, লেখক ও ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন।

২০১৭ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয়ী মানুষী চিল্লারের উদাহরণ দিলেই ভারতীয় সুন্দরীদের মগজের দৌড় কতখানি বোঝা যায়। মিস ওয়ার্ল্ডের গ্র্যান্ড ফিনালেতে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনার মতে কোন পেশাটির বেতন সর্বোচ্চ হওয়া উচিত এবং কেন?’ মানুষীর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরই গ্র্যান্ড ফিনালে’র বাকি প্রতিযোগীদের থেকে তাকে আলাদা করেছিল এবং বিচারকদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই সুন্দরী অবশ্যই বিশেষ এক নারী।

সেসময় মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ুয়া এই সুন্দরী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি স্যালারি বলতে কেবল ক্যাশ টাকা বুঝি না, বরং বুঝি ভালোবাসা আর সম্মানও। সেই স্যালারিটাই আমাদের মায়েদের দেয়া উচিত। আমার মা যেমন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, এবং সব মায়েরাও যেভাবে তাদের সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেন, সেজন্য তাদেরকেই আমার মতে সর্বোচ্চ বেতন (ভালোবাসা ও সম্মান) দেয়া উচিত।’

গায়ের চামড়া কতটা ফর্সা, ফিগার কত বেশি সেক্সি -এই ফর্মুলা মেনে মানুষীদের বিশ্বসুন্দরীর মুকুট পরানো হয়নি। আর ব্রেইনলেস বিউটি বাছাইয়ের মাধ্যমে তাদেরকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠানোও হয় না। অথচ আমাদের মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা জানে না H2O কী, জানেন না Wish শব্দের মানে। সব দেখে মনে খেদে একটাই মন্তব্য আসে, ‘হায়রে বাংলাদেশ… হায়রে মিস ওয়ার্ল্ড…’

fb-share-icon35
fb-share-icon20

Enjoy this blog? Please spread the word :)