সোমবার | ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং |

মাধবদীতে ধনীর মেয়ে বিয়ে করাই কি কাল হলো; রুবেল মিয়া দুই বছর ধরে নিখোঁজ

নিউজ ডেস্ক,সোমবার,২৯ অক্টোবর ২০১৮:

'আমরা গরিব। তাই আমাদের ছেলের খোঁজ দিতে কারও আগ্রহ নেই। ছেলেটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেল! প্রেম করে বিয়ে করেছে। মেয়ের বাবা বড় লোক। গরিব বলে কি ভালোবাসা অপরাধ! বিয়ে করাই কি ওর কাল হলো? দুই বছর ধরে এখানে-ওখানে ঘুরছি। কেউ পাত্তা দেয় না।

তদন্ত কর্মকর্তার নম্বরে ফোন করলে বলে- রং নম্বর। এর পর লাইন কেটে দেওয়া হয়। পরে আবার খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওটাই তদন্ত কর্মকর্তার নম্বর। দুই বছর পর হঠাৎ ৭ অক্টোবর বাপটার মোবাইল নম্বর কিছু সময়ের জন্য খোলা পেলাম। এর পর আবার বন্ধ। এটাও পুলিশ-র‌্যাব কাউকে জানাতে পারছি না। ছেলেকে কেউ মেরে ফেলছে কি-না- তা নিশ্চিত হতে পারলেও মনকে এক ধরনের প্রবোধ দিতাম।' একমাত্র ছেলে রুবেল মিয়ার (২৫) খোঁজ না পেয়ে এমন আক্ষেপ ঝরল তার বাবা নছিমন চালক বজলুর রহমানের কণ্ঠে। ছেলেকে খুঁজে পাবেন না- তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চান না তিনি। তবে শুরু থেকেই প্রশাসনের সহায়তা না পেয়ে মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে পড়ছেন তিনি।

বজুলর রহমানের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের ধুপুরিয়া গ্রামে। তবে দীর্ঘদিন তিনি পরিবারসহ বসবাস করে আসছিলেন নরসিংদীর মাধবদীর মনোহরপুরে।

সেখানে থাকাকালে ২০১০ সালে বজলুর রহমানের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিয়ে হয় ওই এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আফজাল হোসেনের মেয়ে তানিয়া আক্তারের। তাদের সংসারে আকাশ নামে এক সন্তানও রয়েছে। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই হঠাৎ রুবেলের মোবাইলে ফোন করে ডেকে নেন তার শ্যালক ইয়ামিন। এর পর থেকে আর তার খোঁজ নেই। তার পরিবারের অভিযোগ, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে রুবেলকে গুম করা হয়েছে।

রুবেলের হতদরিদ্র বাবা ছেলের ব্যাপারে তথ্য জানাতে গত শনিবার টাঙ্গাইল থেকে ছুটে আসেন সাংবাদিকদের কাছে। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, নছিমন চালিয়ে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। রুবেল পড়ত মাধবদীর এইচপি স্কুলে। সেখানে পড়াশোনাকালে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় মাধবদীর বিশিষ্ট কাপড় ব্যবসায়ী আফজাল হোসেনের মেয়ে তানিয়ার। ২০১০ সালে তারা পালিয়ে বিয়ে করে। এ ঘটনার সূত্র ধরে আফজাল হোসেনের পরিবারের করা মামলায় রুবেলের বাবা বজলুরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এর পর ৯ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে এ নিয়ে টানাপড়েন। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে রুবেলকে ফোন করেন তার শ্যালক ইয়ামিন। এর পর ইয়ামিনের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় সে। ওই দিন রাত ৮টার দিকে রুবেলের মোবাইলে ফোন করেন তার স্ত্রী। পরে সাড়ে ৮টার দিকে ফোন করলে রুবেলের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

বজলুর রহমান বলেন, ঘটনার পর নরসিংদীর ওসির সঙ্গে দেখা করলে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন- এমন মামলা দিয়ে ভেতরে ঢুকাইয়্যা দেব যেন পইচ্যা-গইল্যা মরস। বজুলর রহমান আরও জানান, ১৭ অক্টোবর নরসিংদীর মাধবদীতে রুবেলের শ্বশুরের বাসায় গোপন জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। ওই বাসায় থাকা দুই নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণ করে। এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রুবেলের আরেক শ্যালক। ধারণা করা হচ্ছে, সেও জঙ্গি কার্যক্রমে সক্রিয়। তাই নতুন আতঙ্ক উ?ঁকি দিচ্ছে বজলুরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। তানিয়ার পরিবার কোনো না কোনোভাবে ক্ষতি করতে পারে- এ আশঙ্কায় মাধবদী ছেড়ে টাঙ্গাইলে নিজ গ্রামে ফিরে গেছেন রুবেলের মা-বাবা।

জানা যায়, রুবেল নিখোঁজের পর তার স্ত্রী থানায় জিডি করেন। বজলুর বাদী হয়ে ইয়ামিনসহ চারজনকে আসামি করে নরসিংদীর আদালতে মামলাও করেন। সেটি তদন্তের জন্য মাধবদী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন আদালত।

বর্তমানে এ ঘটনার তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক মোশাররফ খান। তবে রুবেলের পরিবারের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা তাদের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন না। কয়েক দফায় তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেও তার সাক্ষাৎ পাননি। তদন্তের নামে শুধু সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। বাড়ছে পরিবারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

এদিকে ছেলের সন্ধান চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপির কমপ্লেইনস মনিটরিং সেলে আবেদন করেছেন বজলুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, অভিযুক্তরা মাধবদী এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় এ ঘটনার কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তিনি। অভিযুক্ত রুবেল ও তানিয়ার বিয়ে মেনে না নেওয়ায় তাকে গুম করে ফেলেছেন। অসহায় ও দরিদ্র লোক হওয়ায় কেউ রুবেলের ব্যাপারে কোনো খোঁজ-খবর করছে না।

জানা যায়, ৭ অক্টোবর রুবেলের ফোন খোলা পায় তার পরিবার। ফোনের ওপাশ থেকে 'মিনহাজ' পরিচয়ে বলা হয় 'রং নম্বর'। এর পর কেটে দেওয়া হয় ফোন লাইন। দীর্ঘ দিন পর রুবেলের মোবাইল খোলা পাওয়ায় আশায় বুক বাঁধছেন তার পরিবারের সদস্যরা। এর সূত্র ধরে যদি খোঁজ মেলে রুবেল মিয়ার!

রুবেলের শ্যালক ইয়ামিন বলেন, ঘটনার দিন এক বন্ধুর কারখানায় চাকরি দেওয়ার জন্য রুবেলকে ফোন করেন তিনি। বোনের স্বামীর ভালোর জন্যই তিনি চিন্তা করছিলেন। কিন্তু রুবেলের খোঁজ না মেলার পর এখন উল্টো অভিযোগ করা হচ্ছে- তাকে গুম করা হয়েছে। তার দাবি, এলাকার অনেকে রুবেলের কাছে টাকা পেত। হয়তো টাকা শোধ করার ভয়ে সে আত্মগোপন করেছে।

রুবেলের স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে এক সময় অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি। এখন আর কথা বলতে ভালো লাগে না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন বলেন, রুবেলের খোঁজে তাদের কাছে কোনো ইতিবাচক তথ্য নেই। তার মোবাইল ফোন খোলা পাওয়া গেলে সেই সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। তদন্তে গড়িমসির বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। … খবর: সমকাল

 

fb-share-icon35
fb-share-icon20

Enjoy this blog? Please spread the word :)