রবিবার | ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং |

অবশেষে মিন্নি গ্রেফতার, হত্যায় সরাসরি জড়িত

বরগুনা | মঙ্গলবার,১৬ জুলাই ২০১৯:
বরগুনায় প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত রিফাত শরিফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর নানা আলোচনা-সমালোচনায় মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

রাত সাড়ে ৯ টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে একথা জানিয়েছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন।

তিনি জানান, সকাল সাড়ে নয়টার পর তার বাসা থেকে তাকে পুলিশ তাকে পুলিশ নিয়ে আসে। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যায় তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরপরই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। বুধবার (১৭ ‍জুলাই) তাকে আদালতে হাজির করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। অনেকেই মনে করছেন নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করা হলে ঘটনার আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এ ঘটনায় মামলার এক নম্বর সাক্ষী মিন্নি।

রিফাত হত্যার পর পরই অনেকেই মিন্নিকে দোষারোপ করে তাকে গ্রেফতারের দাবি তুলে। স্যোস্যাল মিডিয়াসহ সারা দেশে বিতর্কের ঝড় বইতে শুরু করে। এরপর গত শনিবার (৬ জুলাই) নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজে মিন্নির স্বাভাবিকভাবে হাঁটার কারণে অনেকেই তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভিডিও ফুটেজের ৫ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে দেখা গেছে, নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ ১০-১২ জন রিফাতকে মারধর করতে করতে বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে বের হচ্ছে। এদের মধ্যে একজন পেছন থেকে রিফাতকে ধরে রেখেছে। বাকি দুজন দুই হাত ধরেছে। ৫ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের ফুটেজে মিন্নিকে দেখা যায়, তার বাম হাতে একটি পার্স ছিল। তিনি পার্স হাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিল। একবার ডানেও তাকিয়েছেন কলেজের দিকে।

ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যায়, নয়নের সঙ্গীরা যখন রিফাতের মাথায় আঘাত করছিল তখনও স্বাভাবিক ছিলেন মিন্নি। ৫ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে যখন সব বন্ধুরা একসঙ্গে রিফাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন প্রথমবারের মতো দৌড়ে যান মিন্নি। প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। যখন দা বের করে রিফাতকে কোপানো শুরু হয় তখন পেছন থেকে মিন্নিকে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়।

এ ঘটনার পর নয়ন ও তার সঙ্গীরা পালিয়ে যাওয়ার পর কোনও একজন মিন্নিকে তার পার্সটি মাটি থেকে হাতে তুলে দেন। মিন্নি স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। এ ঘটনার ৮ মিনিট পর একটি মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা।

এদিকে গত শনিবার (১৩ জুলাই) রাতে সংবাদ সম্মেলনে পুত্রবধূ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে দায়ী করে গ্রেফতার করার দাবি জানিয়েছেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ।

সংবাদ সম্মেলনে দুলাল শরীফ বলেন, ‘রিফাত শরীফের সাথে বিয়ের সময় কুখ্যাত সন্ত্রাসী নয়নবন্ডের সাথে মিন্নির বিয়ের ঘটনা মিন্নি ও তার পরিবার সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। রিফাতের সাথে বিয়ের পরেও মিন্নি নয়নের বাসায় যাওয়া আসাসহ নিয়মিত যোগাযোগ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগের দিন সকাল ৯টায় এবং সন্ধ্যায় মিন্নি নয়নের বাসায় যায়। মিন্নি অন্যান্য দিন রিফাতকে ছাড়াই কলেজে গেলেও ঘটনার দিন রিফাতকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে যায়। ঘটনার দিন রিফাত কলেজ থেকে মিন্নিকে নিয়ে চলে আসতে চাইলেও মিন্নি তার সঙ্গে না এসে কালক্ষেপণ করতে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিফাত যখন আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় একা একা রিকশা করে হাসপাতালে যাচ্ছিল তখন মিন্নি তার ব্যাগ ও স্যান্ডেল গোছানোর কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল। এছাড়া আসামিদের একজন রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে মিন্নির হাতে দেয়। রিফাত শরীফকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার সময়ও মিন্নি রিফাতের সঙ্গে যায়নি।’

রিফাতের বাবার দাবি, ‘প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতায় রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত এ পর্যন্ত ১৪ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে আমাকে বলতে হচ্ছে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূলহোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে।’

এ বিষয়ে মিন্নি বাবা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফের হৃদযন্ত্রে রিং পরানো আছে, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তাই তার কথার কোনও ভিত্তি নেই। মিন্নি দোষী না অপরাধী তা পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।’

এদিকে গত ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড। নয়নের মা শাহিদা বেগম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমার ছেলে তো মারাই গেছে। আমার তো আর মিথ্যা বলার কিছু নেই। মিন্নি যে মঙ্গলবারও (রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের আগের দিন) আমাদের বাসায় গিয়েছিল তা আমার প্রতিবেশীরাও দেখেছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মঙ্গলবারই নয়; রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও মিন্নি নিয়মিত আমাদের বাসায় এসে নয়নের সঙ্গে দেখা করত। মোটরসাইকেলে মিন্নিকে রিফাত কলেজে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত। এরপর মিন্নি আমাদের বাসায় চলে আসত। আবার কলেজের ক্লাস শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে মিন্নি আমাদের বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যেত।’

রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নি জড়িত দাবি করে নয়নের মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘রিফাতের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের খবর পাওয়ার পর আমি আমার ছেলেকে অনেক নিষেধ করেছি, যোগাযোগ না রাখতে। কিন্তু আমার ছেলে নয়ন কখনও আমার কথা শুনত না। ওর মনে যা চাইতো ও তা-ই করত। নয়ন যদি আমার কথা শুনত তাহলে এমন নির্মম ঘটনা ঘটত না।’

পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পরদিন থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও পুলিশের কোনও কর্মকর্তার সঙ্গে সহযোগিতা করেননি মিন্নি। পুলিশ তার বাড়িতে গেলে সে স্বামীর দুঃখে কাতর জানিয়ে পুলিশের সাথে খুব একটা কথাও বলেননি। তবে সেই সময় থেকেই তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

fb-share-icon35
fb-share-icon20

Enjoy this blog? Please spread the word :)