বৃহস্পতিবার | ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং |

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনা টাকায় মিমাংসার অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক | শনিবার,৩ আগস্ট ২০১৯:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পৃথক দুটি ধর্ষণের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ধর্ষকদের ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।

ধর্ষণের অপরাধে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি দুই ধর্ষণকারীকে পৃথক ভাবে একজনকে দিনভর আটকে রেখে মারধর এবং অপরজনকে ১০০ বেত্রাঘাত করা হয়েছে। বিষয়টি চেয়ারম্যানের দেয়া ভিডিও বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং ইউনিয়নে। গত পহেলা আগস্ট উক্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরোয়ার চৌধুরী শাহীনের দেয়া এক ভিডিও বক্তব্যে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। চেয়ারম্যানের দেয়া ভিডিও বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে পুরা উপজেলাজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। প্রশ্ন উঠেছে একজন চেয়ারম্যান পৃথক দুটি ধর্ষণের ঘটনা আর্থিক জরিমানা আর শারীরিক শাস্তির মাধ্যমে সমাধানের আইনি এখতিয়ার রাখেন কিনা?

গত পহেলা আগস্ট চেয়ারম্যানের দেয়া ভিডিও বক্তব্য থেকে জানা যায় , গত ২৯ জুলাই তার ইউনিয়নের ফকিন্নির হাট এলাকায় ১০ বছরের এক শিশুকে মাছের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে জনৈক মাওলানা বাদশা। ধর্ষিত শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে খবর পেয়ে চেয়ারম্যান চৌকিদার দিয়ে উক্ত মাওলানাকে ধরে আনেন চেয়ারম্যানের বাড়িতে। সেখানে তাকে সারাদিন আটকে রেখে পিটানো হয় এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার পর ছেড়ে দেয়া হয় তাকে। এ বিষয়ে ভিকটিমের পরিবারকে কোথাও অভিযোগ করতে দেয়া হয়নি।

তার দুদিন পর ইউনিয়নের লাল পুল এলাকায় ৩১ জুলাই ৯ বছরের শিশুকে ৫০ টাকার প্রলোভনে রাস্তার পাশে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে বত্তাইয়া নামে এক ফেরীওয়ালা। তাকেও চৌকিদার (গ্রাম পুলিশ) দিয়ে ধরে এনে ১০০ বেত্রাঘাত করা হয় এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

দুটি ঘটনায় আদায়কৃত জরিমানা ইউনিয়ন পরিষদ কোষাগারে জমা রেখেছেন বলে চেয়ারম্যান তার ভিডিও বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

ফটিকছড়ির ১৩ নং লেলাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরোয়ার চৌধুরী শাহীন স্থানীয় এক সংবাদকর্মীর প্রশ্নের জবাবে এসব ঘটনার কথা বলেন।

লেলাং ইউপি সদস্য মোহাম্মদ ওসমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

তবে এ ব্যাপারে ফটিকছড়ি থানার অফিসার্স ইনচার্জ বাবুল আকতার বলেন,এ ধরনের কোনো অভিযোগ বা তথ্য তাঁর কাছে আসেনি।

ভিডিওটিতে চেয়ারম্যান বলেন, ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত র্কমর্কতা বাবুল আকতার তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন। কিন্তু তারা যখন সন্ত্রাসী/অপর্কমকারীকে ধরে কোর্টে চালান দেন, তারা (অপরাধীরা) দুদিন পর জামিনে এসে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখায়, তাই আইন হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন মর্মে জানান। নিয়মতান্ত্রিক ভাবে তাদেরকে পুলিশে হস্তান্তর করার দরকার ছিল উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন সমাজ থেকে এসব অপকর্ম স্বমূলে বন্ধ করতেই এমনটাই করেছেন তিনি।

চেয়ারম্যান শাহীন বলেন, গত কিছু দিন আগে ফটিকছড়ির সাংসদ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা এবং পরবর্তীতে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে মতবিনিময়কালে ফটিকছড়ির সকল ইউনিয়ন থেকে মাদকসহ সকল অপকর্ম নির্মূলে চেয়ারম্যানদেরকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।

সাংসদের এমন নির্দেশনা পেয়ে তিনি মাদকসহ ধর্ষণের মতো এমন জঘন্য অপকর্ম দমনে মাঠে নেমেছেন বলে বক্তব্যে তুলে ধরেন।

ফটিকছড়ির উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ফটিকছড়ি থানার ওসি বাবুল আক্তারের অনুপ্রেরণাসহ সার্বিক সহযোগিতায় তিনি এ অভিযানে নেমেছেন বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে চেয়ারম্যান শাহীনের মাদক বিরোধী অভিযানে চেয়ারম্যান ও তার অনুগত লোকদের হাতে হামলার শিকার হয়েছেন উক্ত ইউনিয়নের চারালিয়া হাট এলাকার বেশ কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসী। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো ইউনিয়ন। গত ৩১ জুলাই চেয়ারম্যানের মাদক বিরোধী অভিযানে আহত বেশ কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসী ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন সড়ক অবরোধ করে গত বৃহস্পতিবার। ইউনিয়নের রায়পুরের আহত রবিউল হাসান বাচ্চু টুয়েন্টি নাইন খেলার কথা স্বীকার করে বলেন, টুয়েন্টি নাইন খেলা যদি অপরাধ হয়, তাহলে চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে পরিষদে নিয়ে বিচার করতে পারতেন। প্রাথমিকভাবে সাবধান করতে পারতেন, পুলিশে বা জেলখানায় দিতে পারতেন। কিন্তু এভাবে রাতের অন্ধকারে কিরিচ, হকিইস্টিক ও লাঠিসোটা দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার আইন আমার বোধগম্য নয়। আরেকটু হলে আমি মরেই যেতাম। ওই রাতে আরো যারা আহত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন তারা হলেন, শিমুল চন্দ্র নম, মোহাম্মদ মঞ্জু , অনিল চন্দ্র নম, রানা চন্দ্র নম, মোহাম্মদ আলী।

ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল দশ টার দিকে নিরীহ লোকজনের উপর হামলার প্রতিবাদে ছাড়ালিয়ার হাট বাজার সড়কে গাছ ফেলে স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করার ফলে প্রায় আধঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে ফটিকছড়ি থানা পুলিশ এসে অবরোধ তুলে দেন।

উল্লেখ্য ফটিকছড়ি সাংসদ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী সম্প্রতি সাংবাদিক, বিশিষ্টজন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় কালে ধর্ষণের বিচার সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে হবে না বলে তিনি প্রশাসনকে কঠোর হস্তক্ষেপে তা দমন করার নির্দেশ দেন।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট তরুণ কিশোর দেব বলেন, চেয়ারম্যান নিজেই ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। ইউপি চেয়ারম্যান একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাদের স্থানীয় সরকারের আওতাধীন কি কি বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারবে আইন আছে এবং সরকার তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে এসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত সচেতন ও অভিজ্ঞ করে তুলছে, যখন-তখন তিনি এরকম মনগড়া বিচার করতে পারেন না। তার উচিত ছিল ঘটনাটি জানার সাথে সাথে ভিকটিম ও ধর্ষককে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা কিংবা থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা।

ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা এধরনের ঘটনার বিচার একজন চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান সরোয়ার শাহীন বলেন, ধর্ষণের বিচার তিনি করতে পারবেন না। কিন্তু ধর্ষণের চেষ্টা হলে, সে বিচার তিনি করতে পারবেন।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মসিহ উদ দৌলা রেজা বলেন, ধর্ষণ ঘটনায় চেয়ারম্যানের কোনো ক্ষমতা নেই শালিশ-বিচার করার। এটি সরাসরি আদালতেই বিচার হবে।

fb-share-icon35
fb-share-icon20

Enjoy this blog? Please spread the word :)