শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো ট্রাম্পের ইরান বৈঠক

ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা টোয়েন্টিফোর- / ১৪ পাঠক
প্রকাশকাল শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের জনপ্রিয়তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করেছেন। তবে বৈঠক শেষে তিনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি।

স্থানীয় সময় শনিবার (৩০ মে) হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, একটি সম্ভাব্য চুক্তি এখনো নাগালের মধ্যে থাকলেও ইরানের জন্য তহবিল ছাড় করাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবৃতিতে বলেন, ‘সিচুয়েশন রুমের বৈঠক শেষ হয়েছে এবং এটি প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সম্মত হবেন, যা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করবে এবং তার নির্ধারিত লাল রেখাগুলো পূরণ করবে। ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।’

বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বিষয়ে কীভাবে এগোনো হবে, সে বিষয়ে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি বৈঠকে যাচ্ছেন।

তবে তেহরানের সঙ্গে অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দাবি করেন, ইরান হরমুজ প্রণালীতে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করবে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করে ধ্বংস করা হবে।

তেহরান পরবর্তী ধাপের আলোচনায় যাওয়ার আগে ‘১২ বিলিয়ন ডলার জব্দ ইরানি সম্পদ অবিলম্বে ছাড়ের’ দাবি জানিয়েছে- এমন খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ লেনদেন করা হবে না।’

ইরান কী বলেছে
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি এবং দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি টিভিকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান আলোচনায় ইরানের প্রধান লক্ষ্য হলো ‘যুদ্ধের অবসান ঘটানো’।

তিনি আরও বলেন, ‘এই পর্যায়ে আমরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত বিস্তারিত কোনো বিষয়ে আলোচনা করছি না।’

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ‘শুধুমাত্র ইরান ও ওমানের বিষয়’।

তিনি বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ৪৭ বছর আগেই ‘অবশ্যই’ ধরনের ভাষা থেকে বিদায় নিয়েছে।”

৮ এপ্রিলের নাজুক যুদ্ধবিরতির পর এক সপ্তাহ ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আমরা সংলাপের মাধ্যমে ছাড় পাই না, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পাই।’

তিনি আরও বলেন, ইরানের ‘গ্যারান্টি বা কথার ওপর কোনো আস্থা নেই এবং অন্য পক্ষ প্রথম পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।’

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি, যিনি দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান শর্ত নির্ধারণ করে: টাকার বিনিময়ে টাকা, ক্রেডিটের বিনিময়ে ক্রেডিট; কিছু না পেলে কিছু নয়।’

মূল দাবিসমূহ:
ইরানের পারমাণবিক মজুত
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতার ৪৪০ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র-গ্রেড ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধতার কাছাকাছি পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি প্রযুক্তিগত ধাপ দূরে অবস্থান করছে।

ধারণা করা হচ্ছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পারমাণবিক স্থাপনার নিচে এই মজুতের একটি অংশ চাপা পড়ে থাকতে পারে।

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুনরায় খুলে দিতে চায় এবং ৩০ দিনের মধ্যে সেখানে পেতে রাখা মাইন অপসারণের দাবি জানিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান এই কৌশলগত চোকপয়েন্টের ওপর নিজস্ব কর্তৃত্বের দাবি করে এবং বলে, ওমান ও তেহরানের জাহাজ চলাচলকারীদের কাছ থেকে টোল আদায়ের অধিকার রয়েছে।

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি

ইরান চায়, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকুক। নামমাত্র যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও সেখানে সংঘর্ষের মাত্রা সম্প্রতি বেড়েছে।

জব্দ তহবিল ছাড়

তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির অংশ হিসেবে বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইরানি সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

সংস্থাটি জানায়, ‘সমঝোতা স্মারক ঘোষণার শুরুতেই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।’

ইরানের বিদেশে আটকে থাকা সম্পদের কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে অনুমান করেছে।

গ্যারান্টি
তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, যেকোনো চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে ইরানের সন্দেহ রয়েছে।

ইরানের প্রধান আলোচকও যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, তেহরান কেবল ওয়াশিংটনের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর আস্থা রাখবে, কথার ওপর নয়।

যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় ৮ এপ্রিল, যখন ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তবে চলতি সপ্তাহেই ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জবাবে ইরান পাল্টা গোলাবর্ষণ করেছে বলে জানা গেছে। সূত্র: এনডিটিভি


এই ক্যাটাগরির আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর