ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘শেষের পথে’, ইঙ্গিত পুতিনের
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়তো শেষের পথে, এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি জানিয়েছেন, শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হলে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশে বৈঠকে বসতেও আগ্রহী।
শনিবার (৯ মে) মস্কোতে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন পুতিন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এই কুচকাওয়াজে তিনি ইউক্রেনে রুশ সেনাদের অভিযানকে ‘ন্যায্য উদ্দেশ্য’ বলে উল্লেখ করেন।
পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া ‘ন্যাটো জোটের সশস্ত্র ও সমর্থিত একটি আগ্রাসী শক্তির’ বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
মস্কোর রেড স্কোয়ারে সৈন্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিজয় সবসময় আমাদেরই ছিল এবং থাকবে।’
শান্তি আলোচনার ইঙ্গিত
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পুতিন পশ্চিমা ‘বিশ্বায়নবাদী অভিজাতদের’ এই যুদ্ধের জন্য দায়ী করেন।
তার অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর ন্যাটো পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে নিজেদের বলয়ে টানার চেষ্টা করেছে।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি শেষ হতে চলেছে।’
রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্প্রতি তিন দিনের যুদ্ধবিরতি এবং এক হাজার বন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে। এতে নতুন করে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার সেনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণ করে রাশিয়ায় বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। এই যুদ্ধে নিহত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিককে সম্মান জানানো হয়।
তবে এবারের কুচকাওয়াজ ছিল তুলনামূলক নিরুত্তাপ। রেড স্কোয়ারে ভারী সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনের বদলে বড় পর্দায় ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
এবারের কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়ার সেনারাও অংশ নেয়। রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে মস্কোর বাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য পিয়ংইয়ংকে সম্মান জানাতেই এই অংশগ্রহণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ
এর আগে রাশিয়া একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অভিযোগ তোলে। পরিস্থিতির মধ্যে নতুন মোড় আসে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তার আহ্বানে রাশিয়া ও ইউক্রেন শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি এবং এক হাজার বন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘এই যুদ্ধবিরতিতে সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে এবং উভয় দেশ এক হাজার বন্দি বিনিময় করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন শান্তি চুক্তির আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। আশা করি, এটি দীর্ঘ ও প্রাণঘাতী এই সংঘাতের অবসানের সূচনা হবে।’
জেলেনস্কির পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের ঘোষণার পর জেলেনস্কি বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে রাশিয়াকে বিজয় দিবস উদযাপনের অনুমতি দিয়ে একটি ডিক্রি জারি করেন এবং ইউক্রেনের হামলার জন্য রেড স্কোয়ারকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করেন। তবে ক্রেমলিন এই মন্তব্যকে ‘হাস্যকর রসিকতা’ বলে উড়িয়ে দেয়।
জেলেনস্কি আগেও শান্তি আলোচনার জন্য পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে মস্কোয় বৈঠকের রুশ প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
গতকাল শনিবার পুতিন বলেন, তৃতীয় কোনো দেশে বৈঠক সম্ভব, তবে সেটি কেবল একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি অনুমোদনের জন্যই হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি আলোচনার জন্য নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক সমঝোতার চূড়ান্ত চুক্তি হওয়া উচিত।’
দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ
১৯৯৯ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাশিয়া শাসন করে আসা পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছেন। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত হয়েছেন, ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং রাশিয়ার অর্থনীতিও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
যদিও রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, তবুও পূর্বাঞ্চলের পুরো ডনবাস অঞ্চল এখনো দখল করতে পারেনি মস্কো।
এদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা সম্প্রতি বলেছেন, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, আলোচনার জন্য তার পছন্দের ব্যক্তি হলেন জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডার। সূত্র: আল জাজিরা







