সিলেটে ট্রিপল মার্ডার: সিসি ক্যামেরা এড়াতে লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যা!
সিলেট নগরীর সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত মিতালী আবাসিক এলাকায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারটি হয়েছে লোডশেডিংয়ের সুযোগে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনাটি বেছে নেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ওই বাসার প্রতি নজর রাখা দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
ঘটনার পরপরই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তিনটি শাখা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১নম্বর বাসার দোতালা থেকে এম এ সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসএমপির মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাদের গলা কেটে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে, নিহত এম এ সাত্তার দম্পতি মিতালি আবাসিক এলাকার প্রথম বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও আওয়ামী লীগের একজন পুরোনো কর্মী হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তাদের। দুজনই সপরিবারে লন্ডন থাকেন। মিতালি আবাসিক এলাকা পুরোটা সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। ১১১নম্বর বাসায়ও ছিল নিজস্ব সিসি ক্যামেরা। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকায় মহল্লার ও বাসার সিসি ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়েনি।
লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে ধারণা করে প্রাথমিক তদন্তে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি সূত্র বলছে, এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রতি নজর রাখা দুর্বৃত্তরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ বিষয়টিকে সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহল্লার সিকিউরিটি গার্ডের বিল উত্তোলনকারীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
সিকিউরিটি গার্ডের ভাষ্য, বাসায় দুজন কাজের মেয়ে থাকতেন। অপর কাজের মেয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাসার নিজস্ব গাড়িচালকের ভাষ্য, গত প্রায় এক মাস ধরে নিচতলার ভাড়াটের সঙ্গে সমস্যা ছিল। নিচতলার ভাড়াটে ছয় মাস ধরে বিদায় করতে পারছিলেন না। গত মাসে ওই ভাড়াটে বিদায় হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে এসবের যোগসূত্র আছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভাড়াটে বিদায় করার বিষয়ে মহল্লার কমিটির একজন সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, ‘জায়গা-জমির ব্যবসা করা ওই ভাড়াটেকে মহল্লার কমিটি বসে বিদায় করেছে। সত্তার সাহেবই মহল্লার কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে বলেছিলেন, আমার বাসা ছাড়ে না, ভাড়াও ঠিকমতো দেয় না।’
হত্যার খবরে পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি তাৎক্ষণিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বাসার ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা আছে। স্বর্নসহ দামি জিনিস খোয়া গেছে বলে জেনেছি। চুরি-ডাকাতির ঘটনা কি না, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য কোনো কারণে হত্যা করা হয়েছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পারিবারিক বিরোধ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছি।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই তিন বিষয় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘তিনজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। তবে অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।’
এসএমপি কমিশনার বলেন, ‘সকালে ওই বাসার প্রতিবেশীরা আমাদের জানান, বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে এবং দরজা বন্ধ। এমন খবর পেয়ে পুলিশ টিম ঘটনাস্থলে যায়। দরজা খুলে তারা আমাদেরকে জানায়। পিবিআই ও সিআইডি ক্রাইমসিন নিয়ে যারা কাজ করেন তারাও পর্যবেক্ষণ করছে। একটা স্পেশাল টিম গঠন করে দিয়েছি তদন্ত করার জন্য। ভাড়াটিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী সকালে চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছেন। সে হিসেবে ঘটনা সকালে ঘটেছে। আমরা আরও তদন্ত করে জানাব।’
পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ‘ঘটনাটি ডাকাতি, নাকি এর পেছনে পারিবারিক কোনো শত্রুতা বা পূর্ববিরোধ রয়েছে, সেটিও আমরা তদন্ত করে দেখছি। এখানে একটি দলিলও পাওয়া গেছে। সেটিও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডাকাতির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, পুলিশের বিশেষ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। ঘটনার বিষয়ে কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে পুলিশকে জানানোর জন্যও অনুরোধ করেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডে কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, ‘তাদের কোনো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে কি না, সেটিও আমরা দেখছি। তবে আপাতত ঘটনাস্থলের ক্রাইম সিনে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।’







