সাতক্ষীরা নৈতিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ এমপিকাণ্ড
এক তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ‘ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের’ ভিডিও নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া (ভাইরাল) সেই ভিডিও নিয়ে প্রায় সবখানেই চলছে মুখরোচক নানা আলোচনা।
প্রশ্ন উঠেছে ওই এমপির নীতি-নৈতিকতা নিয়েও। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছাড়াও তাদের একাধিক ভিডিও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
যদিও তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কাজ বলে প্রথমদিকে দাবি করা হয়।
অথচ ‘ফ্যাক্টচেকার’ প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানায়, এআই দিয়ে তৈরি নয়, বরং ভিডিওটি সত্য। পরেই আবার সেই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি, পরস্পরবিরোধী পারিবারিক বক্তব্য এবং তরুণীর চাকরির জন্য তৈরি করা ‘বায়োডাটায়’ সচিব বরাবর ওই এমপির সুপারিশ করার বিষয়টি বাড়তি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই বায়োডাটায় তরুণীর বৈবাহিক অবস্থার জায়গায় অবিবাহিত লেখা রয়েছে। এর আগে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসকের ‘চেহারা ও সংস্কৃতি’ নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচিত হন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
নতুন করে তরুণীর সঙ্গে একটি কক্ষে একসঙ্গে থাকার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দলীয়ভাবেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বশীল নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ‘ভিডিওটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ওই এমপি আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েটির বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে হলেও তার পরিবার বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে এক তরুণীসহ অবস্থানকালে এমপি গাজী নজরুল হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছেন। আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে ওই এমপিকে সেই তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কিছু সময়ের দৃশ্যে দেখা যায়। ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর পরই সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে দাবি করা হয়, এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও। তবে পরবর্তী সময়ে দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়।
অন্যদিকে ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিলে মরিয়ম খাতুন নামের সেই তরুণী এক ভিডিও বার্তায় দাবি করে বলেন, ‘গত ১৭ জুন আমাদের বিয়ে হয়েছে। শ্যামনগরে আমাদের নিজেদের বাসায় পারিবারিকভাবে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। এটি সম্পূর্ণ বৈধ বিয়ে এবং পরিবারের সম্মতিতেই হয়েছে।’
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি তার পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যের। মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ ‘দ্য ডিসেন্ট’ নামে একটি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাকে বলেন, বিয়েটি ঢাকার মগবাজার এলাকায় হয়েছে। আমরা সেখানেই বিয়ের আয়োজন করি। যদিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার নিজস্ব ভিডিও বার্তায় বিয়ের স্থান সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী দাবি করা মাকসুদা ইসলামও একটি ভিডিও বার্তায় বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। যদিও তিনি অনেকটা লিখিত বক্তব্য দেখে দেখে পাঠ করার মতো করে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, বিষয়টি আমি জানি এবং এতে আমার সম্মতি ছিল।’
তবে একই সময়ে হোটেলে এমপির ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও এবং বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পুরো ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঘটনাকে আরও বিতর্কিত করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি জীবনবৃত্তান্ত।
সেখানে দেখা যায়, ১৭ জুনের কথিত বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ২২ জুন তারিখে ওই তরুণী নিজেকে ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করে একটি বায়োডাটা তৈরি করেছেন। ওই বায়োডাটায় সচিব বরাবর এমপি গাজী নজরুল ইসলাম নিজ হাতে ‘জোর সুপারিশ’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন বলে দাবি উঠেছে। ওই বায়োডাটায় তরুণীর জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২২ মে ২০০৮। সে অনুসারে তার বয়স ১৮ বছর পার হলেও বিয়ের দাবি এবং ওই নথির তথ্যের মধ্যে কিছু অসংগতি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেওয়া এক বিস্তারিত বিবৃতিতে দাবি করেন, ‘গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে পারিবারিকভাবে এবং আমার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। গত ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক অফিসে আমরা অবস্থান করছিলাম। জোহরের নামাজের আগে আমার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে গিয়ে ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত লোককে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা আমাদের জিম্মি করেন এবং এক লাখ টাকা আদায় করেন। পরে ভাড়া করা গাড়ি আটকে রেখে আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করেন। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয় মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন এবং ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এটি একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত।’







